banganews.net

 পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি-র নতুন চেয়ারম্যান হলেন ইসলামপুরের তৃণমূল বিধায়ক কানাইয়া লাল আগরওয়াল। সোমবার বিধানসভার মোট ৪১টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৬টি স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং ১৫টি হাউস কমিটি। নতুন কমিটি বণ্টনে বিরোধী শিবিরের হাতে মোট ১০টি কমিটির দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি স্ট্যান্ডিং কমিটির মধ্যে ৫টি এবং ১৫টি হাউস কমিটির মধ্যে আরও ৫টি কমিটির সভাপতির পদ বিরোধীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। বিরোধীদের জন্য বরাদ্দ ওই ১০টি কমিটির মধ্যে একটি কমিটির দায়িত্ব পেয়েছে নৌশাদ সিদ্দিকির দল। বাকি ৯টি কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছে ঋতব্রত ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবিরের বিধায়কদের। খাতায়-কলমে তিনি তৃণমূল বিধায়ক হলেও আদতে তিনি দলের বিক্ষুব্ধ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের নেতা। মঙ্গলবার বিধানসভা সচিবালয় সূত্রে এই খবরের সত্যতা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। আর এই ঘোষণার পরেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদল হলেও বিধানসভার অন্দরে পুরনো রেওয়াজই বহাল রইল। একদা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যে ‘মুকুল-তত্ত্ব’ শুরু হয়েছিল, সেই একই পথে হাঁটল বর্তমান শাসকদল বিজেপি। সংসদীয় গণতন্ত্রের দীর্ঘদিনের রীতি অনুযায়ী, সরকারি খরচের হিসাব নিকেশ পরীক্ষা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পিএসি-র চেয়ারম্যান পদে সাধারণত বিরোধী শিবিরের কাউকেই বসানো হয়। বর্তমান বিধানসভায় কানাইয়ালাল বিরোধী দলেরই বিধায়ক। কিন্তু দল বিভক্ত হওয়ার পর তিনি শাসকদলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ঋতব্রত শিবিরে যোগ দেন। অর্থাৎ, বিরোধী দলের বিধায়ককে মাথায় বসালেও কার্যত নিজেদের অনুকূল ব্যক্তিকেই এই গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখল বর্তমান শাসকদল। ঠিক যে ভাবে পূর্বতন তৃণমূল সরকার এই প্রথার সূত্রপাত করেছিল। সে সময় খাতায়-কলমে কংগ্রেস বা বিজেপি বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও দলবদলুদের পিএসি-র চেয়ারম্যান করা হতো। কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর প্রথমে মানস ভুঁইয়াকে এই পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি রাজ্যসভার সাংসদ হওয়ার পর একই ভাবে দায়িত্ব পান শংকর সিংহ। পরবর্তীতে বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসা মুকুল রায়কে পিএসি-র চেয়ারম্যান করা হয়। তিনি ইস্তফা দেওয়ার পর দায়িত্ব পান কৃষ্ণ কল্যাণী। লোকসভা নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হওয়ায় বিধায়ক পদ ছাড়েন। তখন আলিপুরদুয়ারের দলবদলু বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলালকে ওই পদে বসানো হয়। সে সময় বিরোধীরা প্রবল আপত্তি জানালেও তৎকালীন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদীয় রীতির যুক্তি দেখিয়ে সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছিলেন। এ বার ঠিক সেই একই সমীকরণে কানাইয়ালালকে বেছে নিয়ে পুরনো ফাঁককেই পুনর্ব্যবহার করল বিজেপি।

বিধানসভায় পিএসি-তে চেয়ারম্যান-সহ সর্বাধিক কুড়ি জন সদস্য থাকেন। বর্তমানে এই কমিটিতে 14 জন শাসকদলের এবং ছ’জন বিরোধী শিবিরের সদস্য রয়েছেন। বিরোধী শিবিরের ওই ছ’জনের মধ্যেই রয়েছেন কানাইয়ালাল। বিধানসভা সূত্রে খবর, মোট 41টি কমিটির মধ্যে দশটির চেয়ারম্যান পদ বিরোধী শিবিরকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটির দায়িত্ব পাচ্ছেন ভাঙড়ের একমাত্র আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। বাকি ন’টি কমিটির মাথাতেই বসছেন ঋতব্রত শিবিরের বিধায়কেরা। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, কালীঘাট পন্থী মূল তৃণমূলের কোনও বিধায়ককে বিভিন্ন কমিটির সদস্য করা হলেও তাঁদের কাউকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ। ক্ষমতার সমীকরণ বদলের পর থেকেই তৃণমূল কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। দলনেত্রীর সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের দূরত্ব বেড়েছে। লোকসভার আঠাশ জন সাংসদের মধ্যে কুড়ি জনই দল ছেড়ে এনসিপিআই গঠন করে শাসকজোটে নাম লিখিয়েছেন। কলকাতা পুরসভাও হাতছাড়া হয়েছে। দলের প্রতীকের অধিকার কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে আইনি লড়াই অব্যাহতো। এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে বিধানসভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটির রাশ বিদ্রোহী শিবিরের হাতে তুলে দিয়ে শাসকদল বিরোধী বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে দিল। বিধানসভায় সাধারণত এগারোটি স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং প্রায় কুড়িটি হাউস কমিটি থাকে। পিএসি ছাড়াও কমিটি অন পাবলিক আন্ডারটেকিংস, কমিটি অন এস্টিমেটস এবং কমিটি অন লোকাল ফান্ড অ্যাকাউন্টস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব ক’টির মধ্যে পিএসি-র মর্যাদা সবচেয়ে বেশি। সেই মর্যাদাপূর্ণ পদটিই পেলেন কানাইয়ালাল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বর্তমান বিধানসভায় স্পিকার রথীন্দ্র বসু, মুখ্য সচেতক অম্লান ভাদুড়ি এবং পরিষদীয় মন্ত্রী শংকর ঘোষ- সকলেই উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধি। এ বার পিএসি চেয়ারম্যান কানাইয়ালালও সেই উত্তরবঙ্গেরই। ফলে প্রশাসনিক ও সংসদীয় ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের এই একাধিপত্য বিধানসভার অন্দরে নতুন রাজনৈতিক কৌশলেরই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।