সমস্ত সমীক্ষার পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণিত করে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক মঞ্চে ডানপন্থী আধিপত্যের স্রোত পেরিয়ে চতুর্থবারের জন্য ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হলেন প্রবীণ বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা । আশি বছর বয়সি এই প্রবীণ নেতা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরাস্ত করেছেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তথা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জাইর বোলসোনারোর পুত্র ফ্লাভিও বোলসোনারোকে। এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লুলা একান্ন দশমিক আট শতাংশ ভোট অর্জন করেছেন, যেখানে তাঁর প্রতিপক্ষ ফ্লাভিও পেয়েছেন আটচল্লিশ দশমিক দুই শতাংশ ভোট। ১৯৪৫ সালে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পেরনামবুকো প্রদেশের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে লুলার জন্ম হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় তিনি প্রথমবার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী হিসেবে ২০০৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করেন। পরবর্তীতে দুই হাজার ছয়ের নির্বাচনেও জয় ছিনিয়ে নিয়ে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন। মাঝে কিছু নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হলেও, দুই হাজার বাইশে এক দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছিলেন এই নেতা। আর এবার দুই হাজার ছাব্বিশের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি জীবনের চতুর্থবারের জন্য দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হলেন। লুলার রাজনৈতিক জীবনে এই ঐতিহাসিক কামব্যাক অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও দুর্নীতির মামলার জেরে দুহাজার আঠারো এবং দুহাজার উনিশ সালে তাঁকে কারাবন্দিও হতে হয়েছিল। সেই কঠিন বাধা পেরিয়ে তিনি দুই হাজার বাইশে ফের রাষ্ট্রপতি পদের দৌড়ে অবতীর্ণ হন এবং তৎকালীন দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি জাইর বোলসোনারোকে পরাজিত করে নিজের রাজনৈতিক শক্তি প্রমাণ করেন। নির্বাচনী প্রচারের সময়ও তিনি এই বিষয়টিকে সামনে এনেছিলেন এবং জোরালোভাবে প্রচার করেছিলেন যে, দুহাজার আঠারো সালে ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ সাহায্যেই বোলসোনারো ক্ষমতার মসনদে বসার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, দক্ষিণপন্থী দল পুনরায় ক্ষমতায় এলে জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন খাতের বাজেট বরাদ্দ কমানো হতে পারে, সামাজিক অসাম্য বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ব্রাজিল অতিরিক্ত মাত্রায় আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, লুলার এই সুচিন্তিত ও সময়োপযোগী রাজনৈতিক প্রচারই তাঁর এই জয়ে অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

চলতি দুই হাজার ছাব্বিশের নির্বাচনের প্রচারের স্বার্থেই জীবনের প্রথম মোবাইল কিনেছিলেন আশি বছর বয়সি লুলা। ভোটের আগে নিয়মিতভাবে নিজের বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচারমূলক পোস্ট করে গিয়েছেন তিনি। নিজের এবং দলের রাজনৈতিক বার্তা আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই অভিনব কৌশল ভোটারদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সমর্থকদের মতে, প্রচারের এই ডিজিটাল ও আধুনিক মাধ্যম ব্যবহারের ফলেই দেশের বিশাল সংখ্যক তরুণ ও সাধারণ মানুষের কাছে নিজের বক্তব্য একযোগে পৌঁছে দেওয়া লুলার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল।