মোবাইলের কভার কিনতে গিয়ে শিয়ালদার শিশির মার্কেটের ব্যবসায়ীদের হাতে আক্রান্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারমাইকেল হস্টেলের পড়ুয়ারা । হকি স্টিক, লাঠি-সহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে । শুধু তাই নয়, বাংলাতে কথা বলায় ওই পড়ুয়াদের বাংলাদেশি বলে আখ্যায়িত করা হয় বলেও অভিযোগ । সব মিলিয়ে আক্রান্ত প্রায় ১০ জন পড়ুয়া । বুধবার রাতে কলকাতার মুচিপাড়া থানার অন্তর্গত শিয়ালদা বিদ্যাপতির সেতু সংলগ্ন এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে । এর প্রতিবাদে কারমাইকেল হস্টেলের বহু পড়ুয়া মুচিপাড়া থানায় বিক্ষোভ দেখান । অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। ঘটনায় দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ৷ কলকাতা পুলিশের ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বলেন, “দোকানের মালিক দীপক কুমার সাউ ও তাঁর সহকারি ইমতিয়াজ আলিকে গ্রেফতার করা হয়েছে ।” আক্রান্ত পড়ুয়াদের বক্তব্য, বুধবার রাতে তাদের এক সহপাঠী শিয়ালদার বিদ্যাপতি সেতু সংলগ্ন দোকানে মোবাইলের কভার কিনতে যান একজন । কিন্তু সেই কভার পছন্দ না-হওয়ায় এক পড়ুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর প্রাথমিক বচসা হয় । ওই পড়ুয়াকে নির্মমভাবে মারা হয় ৷ হস্টেলে ফিরে ওই পড়ুয়া সহপাঠীদের বিষয়টা জানান ৷ চারজন পুনরায় ঘটনাস্থলে যান কারণ জানতে । এরপর দ্বিতীয় দফায় আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে ওই চার পড়ুয়াকে লাঠি হকিস্টিক-সহ ধারলো অস্ত্র দিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ । পড়ুয়াদের অভিযোগ, গোলমালের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আরও কয়েকজন হস্টেল থেকে ঘটনাস্থলে যান ৷ তাঁদেরকেও মারধর করা হয় ৷ আহতদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা গুরুতর । রাতেই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা করানো হয় । রাতে ডিউটিরত পুলিশকর্মীদের বিষয়টি জানালেও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি ৷ সেই খবরও পৌঁছায় হস্টেলে । সেখান থেকে আরও কয়েকজন পড়ুয়া গিয়ে মুচিপাড়া থানায় বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন । অভিযোগ দায়ের করা হয় ওই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে । আক্রান্ত পড়ুয়াদের মধ্যে আফ্রিদি মোল্লা বলেন, “আমার ঘাড়ে-পিঠে লাঠি দিয়ে, হকি স্টিক দিয়ে মারধর করা হয়েছে । জামাকাপড় ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে । আমি বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও আমার কথা তারা শোনেনি । বরং কেন বাংলাতে কথা বলছি, সেই প্রশ্ন তোলা হয় এবং বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হয় আমাকে ।” আক্রান্ত আর এক পড়ুয়া মাসুম মিয়াঁ বলেন, “আমার সহপাঠীরা আক্রান্ত হওয়ার পর আমরা পুনরায় ঘটনাস্থলে যাই কী হয়েছে জানতে । কিন্তু যে ব্যবসায়ী মারধর করেছিল, তারা বিষয়টি অস্বীকার করে । আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী জড়ো হয়ে গালিগালাজ করতে থাকে আমাদের । ওরা হিন্দিতেই কথাবার্তা বলছিল ৷ গালিগালাজ করছিল । তখন আমরা বলি আমরা হিন্দি বুঝতে পারছি না ৷ আপনি বাংলাতে বলুন । এরপরেই ওরা আমাদেরকে বাংলাদেশি বলে কটাক্ষ করে ।’’ ওই পড়ুয়া আরও বলেন, ‘‘বলে যা পারিস কর । আমরা পুনরায় প্রশ্ন করি কেন মারধর করলেন ? এই প্রশ্ন করতে আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী জড়ো হয়ে আমাদেরকে আবারও মারধর করে । আমার ডান কানে চড় মারা হয়েছে । এছাড়া আমাদের অন্যান্য সহপাঠীদের পিঠে হাতে লাঠি, হকি স্টিক দিয়ে মারধর করা হয়েছে ।” মারধরের ঘটনায় থানায় বিক্ষোভে শামিল হন কারমাইকেলের প্রাক্তনীরাও । তাঁদের মধ্যে তাজবুল হক বলেন, “শিয়ালদহ অঞ্চলে বাংলা বলার অপরাধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারমাইকেল হস্টেলের শিক্ষার্থীদের ওপর হিন্দিভাষী দোকানদের আক্রমণকে তীব্র নিন্দা জানাই । এই দুষ্কৃতীরা ব্যাট-হকিস্টিক-ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে আক্রমণ চালিয়েছে । অথচ, কারমাইকেল হস্টেলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের একমাত্র অপরাধ তাঁরা বাংলায় কথা বলেছেন । ঘটনার পর কারমাইকেল হস্টেলের সাধারণ আবাসিক ও শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ তৈরি করেছে । প্রতিরোধের মুখে বাধ্য হয় এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে উগ্র-হিন্দি আধিপত্যকারী দোকানদার ও দুষ্কৃতীরা ।’’ এই ঘটনায় শিয়ালদহ অঞ্চল জুড়ে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয় । এই ঘটনায় কারমাইকেল হস্টেলের গুরুতর আহত ১০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ৷ তজবুল হক জানান, চিকিৎসার পরে আহত আবাসিকদের নিয়ে কারমাইকেলের অন্য শিক্ষার্থীরা দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে মুচিপাড়া থানায় বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত বিক্ষোভ দেখানো হয়৷ শেষে এফআইআর করা হয় ৷ তজবুল আরও বলেন, ‘‘আমাদের বক্তব্য খুব স্পষ্ট ৷ বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দিয়ে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন-আক্রমণ শুধুমাত্র বাংলার বাইরেই নয়, এ রাজ্যেও একাধিক জায়গায় বারবার হচ্ছে ৷ খুব স্পষ্টভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও ভেদাভেদের রাজনীতিকে বাড়তি জমি ও অক্সিজেন প্রত্যেকদিন দেওয়া হচ্ছে এই রাজ্যে । উত্তরবঙ্গ, মালদা ,মুর্শিদাবাদ ও একাধিক জেলা এবং বাইরে রাজ্য ও দেশ থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছে ।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশকে জানিয়েছি ৷ এই ঘটনায় যত দ্রুত সম্ভব দোষীদেরকে চিহ্নিত করে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ৷ না-হলে আমরা তীব্র আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হব ৷’’

এসএফআই-এর রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে বলেন, ‘‘কারমাইকেল হস্টেলে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংখ্যালঘু ছাত্ররা সেখানে থেকে লেখাপড়া করে । গতকাল রাতে একদল দুষ্কৃতী তাঁদের ওপর বাংলাদেশি বলে চড়াও হয় । অন্য রাজ্যে যেভাবে গরিব পরিযায়ী শ্রমিক-সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে, সেভাবে হামলা হয় । কলকাতায় ছাত্ররা নিরাপদ নয় । দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে ।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘কর্তৃপক্ষকে গ্যারান্টি দিতে হবে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার । বিজেপি-আরএসএস ও তৃণমূলের প্রচ্ছন্ন মদতে এই আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে । পুলিশ কেন অভিযোগ প্রথমে নিতে চায়নি ? কলকাতার বুকে এই ধরনের ঘটনা কী করে ঘটে ? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দায় নিতে হবে । শোনা যাচ্ছে এই ঘটনায় দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে । বাংলায় মানুষ যেকোনও ভাষায় কথা বলতে পারে, অন্য রাজ্যের লোক এখানে কাজের সন্ধানে আসতেন । এখানে সব কিছুর মিলনের ক্ষেত্র ছিল ।’’