বঙ্গে বৃহস্পতিবার ভোট-প্রচারে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জনসভার মঞ্চ থেকে একাধিক ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান তিনি৷ পরে বাগুইআটিতে আয়োজিত একটি নির্বাচনী জনসভা থেকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায় পালটা নিশানা করেন মোদিকে৷ এদিন রাজারহাট-গোপালপুর কেন্দ্রের প্রার্থী অদিতি মুন্সি, বিধাননগর কেন্দ্রের প্রার্থী সুজিত বসু ও রাজারহাট-নিউটাউনের প্রার্থী তাপস চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থনে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে সরাসরি মমতার প্রশ্ন, “বাংলা যদি অনুপ্রবেশের কারখানাই হবে, তাহলে আপনাদের বিএসএফ কী করছিল?” নাগরিকত্ব ও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে একহাত নেন মুখ্যমন্ত্রী। বাংলার মানুষকে অনুপ্রবেশকারী তকমা দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে মমতা বলেন, “মিথ্যে কথা বলে বেড়াচ্ছে আমোদী-প্রমোদী দাদারা। বলছে, যাঁদের নাম কাটা গিয়েছে, তাঁরা সবাই অনুপ্রবেশকারী! মানুষকে অপমান করেছে ভোটের লাইনে দাঁড় করিয়ে। আমরা সবাই অনুপ্রবেশকারী, আর তোমরা একা দেশের নাগরিক? বেছে বেছে নাম বাদ দিয়েছে। এই অসম্মানের বদলা এবার নিতে হবে। এবারের নির্বাচন গণতন্ত্রের ভোট, সম্মানের ভোট।” এরপরই প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি নিশানা করে তিনি বলেন, “মোদিবাবু, একটা ছোট্ট প্রশ্ন। আপনি যে বলে গেলেন আমরা নাকি অনুপ্রবেশের কারখানা করেছি, তাহলে আপনার বিএসএফ কী করছিল? বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের দায়িত্ব তো আমাদের হাতে নেই। কাস্টমস কার হাতে? সিআইএসএফ কার হাতে? পাসপোর্ট, এয়ারপোর্ট, রেল — সব তো কেন্দ্রের হাতে! সব আপনারা নিয়ন্ত্রণ করবেন, আর দোষ দেবেন আমাদের নামে? আগে অমিত শাহকে ইস্তফা দিতে বলুন।”

প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “আজকে বাবু বলেছেন, আমরা নাকি মাছ উৎপাদন করি না। বিহার এত মাছ উৎপাদন করে যে বাইরে পাঠিয়ে দেয়। আরে বিহার তো মাছ খায়ই না! রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশে আপনারা তো মাছ-মাংস-ডিমের সব দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। বাঙালিরা মাছে-ভাতে থাকে, কারণ এটা তাদের চিরকালের অভ্যাস। নর্থ-ইস্টার্নরা মাংস খায়, ওটাই তাদের অভ্যাস। আপনি চিরকালের অভ্যাস কী করে ত্যাগ করবেন? কে কী খাবে, তা তার ব্যক্তিগত বিষয়।”

বাগুইআটির এই সভার আগে এদিন বরানগরে একটি বর্ণাঢ্য মিছিল করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই মিছিলে পুলিশের অব্যবস্থা ও নিরাপত্তার অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। নির্বাচন ঘোষণার পর রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসন এখন পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের অধীন।

সেই প্রসঙ্গ তুলে মমতা অভিযোগ করেন, “বরানগরে মিছিলে চারটে জায়গায় প্রায় স্ট্যাম্পেড হয়ে মেয়েরা পড়ে গিয়েছিল। পুলিশের নিরাপত্তা ছিল একেবারে ঢিলেঢালা। একটা সরু ফিনফিনে দড়ি নিয়ে পুলিশ দাঁড়িয়েছিল, আর ওখানে রাস্তায় লক্ষ লক্ষ লোক। বিজেপির মিটিংয়ের জন্য তো বড় বড় ব্যারিকেড থাকে। একটা স্ট্যাম্পেড হয়ে গেলে দায়িত্ব কে নেবে? আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে চার জায়গায় স্ট্যাম্পেড বাঁচিয়েছি, মহিলাদের টেনে টেনে তুলেছি।”

নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় তুলে এদিন মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, বিজেপি এখন দেশে ‘সুপার প্রেসিডেন্ট রুল’ জারি করেছে। তারা সংবিধান মানছে না। রাজ্যের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং নিরপেক্ষ এজেন্সিগুলোকে একপেশে করে দেওয়া হয়েছে। কমিশন তৃণমূলকে যে চিঠি দিয়ে আল্টিমেটাম দিয়েছে, তাতে তিনি গর্বিত বলেও মন্তব্য করেন মমতা। তাঁর মতে, কমিশন বুঝেছে তৃণমূল শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও লড়াই ছাড়বে না এবং মানুষের পাশ থেকে কখনও সরবে না।

বিজেপির বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতি ও মনীষীদের অপমানের অভিযোগ তুলেও এদিন সুর চড়ান তৃণমূল নেত্রী। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে বাবাসাহেব অম্বেদকরের মতো দেশের রূপকারদের বিজেপি সম্মান করতে জানে না বলে তোপ দাগেন তিনি। তাঁর কথায়, “গান্ধিজি যে 100 দিনের কাজের রূপরেখা দিয়েছিলেন, এরা তাঁর নাম বাদ দিয়ে দিয়েছে। নেতাজির প্ল্যানিং কমিশন তুলে দিয়েছে। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছে। এরা ন্যাশনাল সং জানে না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম ভুল বলে। এরা ধর্ম বোঝে না, বিজেপির ধর্ম মানেই হিংসা। আর আমাদের ধর্ম হলো সর্বধর্ম সমন্বয়।”বিরোধীদের অভিযোগ জবাব দিতে উন্নয়নের খতিয়ানও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজারহাট-নিউটাউন এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন৷ মমতা বলেন, “ইকো পার্ক, বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টার, মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম, সিলিকন ভ্যালি আইটি পার্ক — কী হয়নি এখানে? 200 একর জমি দেওয়া হয়েছে, 30 হাজার ছেলেমেয়ের চাকরি হয়েছে। ফ্লাইওভার দিয়ে এখন 20 মিনিটে এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাওয়া যায়।”অপরদিকে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ করেন মমতা৷ তিনি বলেন, “কোথায় গেল অ্যাকাউন্টে 15 লক্ষ টাকা? কোথায় বছরে দু’কোটি চাকরি? বাংলায় বেকারত্ব 40 শতাংশ কমেছে, আর মোদিজি সারা দেশে বেকারত্ব বাড়িয়েছেন। বাংলাকে কম্পেয়ার করতে এসো না।” পরিশেষে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে জোড়াফুল চিহ্নে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান মমতা। বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করার ডাক দিয়ে তিনি বলেন, “যতই করো হামলা, তৃণমূল জিতবে বাংলা। চার তারিখে কাউন্টিং হলে দেখতে পাবেন, হিংসেটেরা জ্বলছে আর লুচির মতো ফুলছে। আগামিদিনে অধিকার বাঁচাতে, শান্তিতে থাকতে হলে একমাত্র দল তৃণমূল কংগ্রেস।”