কলকাতার বুকে এক নতুন ইতিহাসের সূচনা হল। শহরের এককালীন রাজভবন বা বর্তমান জাতীয় গ্রন্থাগার চত্বরে উদ্বোধন হল দেশের প্রথম ‘শব্দ সংগ্রহালয়’ বা মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড-এর। এই অভিনব সংগ্রহালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত-সহ অন্যান্য বিশিষ্টজনেরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাবনায় তৈরি এই সংগ্রহালয়টিকে দেশের সাংস্কৃতিক পুনরুত্থানের একটি অন্যতম মাইলফলক বলে আখ্যা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।শব্দের কোনও আকার নেই। তাকে চোখে দেখা যায় না। অথচ সেই অদৃশ্য শব্দকেই এবার চাক্ষুষ করার সুযোগ মিলবে এই সংগ্রহালয়ে। ওঙ্কার ধ্বনি থেকে শুরু করে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পর্যন্ত ভাষার বিবর্তনের গোটা যাত্রাপথকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এই সংগ্রহালয়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভাষার গভীর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন অমিত শাহ। তাঁর কথায়, “মানুষ মনে করে যে ভাষাকে আমরা তৈরি করেছি। আমি মনে করি যে ভাষা মানুষকে তৈরি করেছে, মানুষ গড়ে তুলেছে।”স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই প্রাণ থাকে। কিন্তু, সে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে তখনই, যখন তার মধ্যে আবেগের সঞ্চার হয়, আর ভাষাই মানুষের সেই আবেগকে জাগ্রত করে। এদিনের অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, একটা সময় এই বাংলাই সমগ্র দেশের চেতনাকে পথ দেখাত। মহর্ষি অরবিন্দ, স্বামী বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতো মহামানবদের পুণ্যভূমি এই বাংলা। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো দেশনায়ক এই মাটিরই সন্তান।সেই অতীত গৌরবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই বাংলাই সর্বদা দেশের থেকে পাঁচ দশক এগিয়ে থেকে দেশকে পথপ্রদর্শন করত।” একটা সময় বিদেশি ও সংকীর্ণ মতাদর্শের কারণে বাংলার এই অবদান কিছুটা ম্লান হলেও, তা ফের স্বমহিমায় ফিরবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলা আবারও সমগ্র ভারতীয় চেতনার বৈশ্বিক আলোকস্তম্ভ হয়ে উঠবে। দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গ্রন্থাগারের ভূমিকার কথাও এদিন স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন অমিত শাহ। তাঁর মতে, শুধু কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় বাড়লেই সমাজের প্রকৃত উন্নতি হয় না। তিনি বলেন, “এই দেশের ভবিষ্যৎ এই কথার উপর নির্ভর করে না যে এই দেশের কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে কতটা ভিড় আছে। এই দেশের ভবিষ্যৎ এই কথার উপর নির্ভর করে, এই দেশের লাইব্রেরিতে কতজন তরুণ এবং কিশোর যায়, এর দ্বারাই এই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত।” আগামী প্রজন্মকে আরও বেশি করে গ্রন্থাগারমুখী করার জন্য তিনি জোর দেন। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারে এদিন পাঁচটি মূল সূত্রের কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, পরিবারই হল শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। তাই মায়ের ভাষাতেই শিশুর প্রথম পাঠ হওয়া উচিত। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষা বা অনুবাদের জায়গা না হয়ে মৌলিক চিন্তন ও গবেষণার কেন্দ্র হয়ে উঠতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতীয় ভাষাগুলিকে আগামী এক হাজার বছরের জন্য আরও সমৃদ্ধ ও সুরক্ষিত করার ডাক দেন তিনি। একইসঙ্গে, গ্রন্থাগার বা মিউজিয়ামগুলিকে শুধু চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে না রেখে তরুণ প্রজন্মের একেবারে কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথাও বলেন। মাতৃভাষার পাশাপাশি দেশের যুব সমাজকে অন্তত আরও একটি ভারতীয় ভাষা শেখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সব শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই শব্দ সংগ্রহালয় আগামী প্রজন্মকে শুধু শিকড়ের সাথে পরিচিতই করবে না, বরং তাদের নতুন দিশা দেখাবে। ভাষার শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে 2047 সালের মধ্যে এক উন্নত ভারত গড়ে তোলার যে স্বপ্ন, তা পূরণে এই মিউজিয়াম বড় ভূমিকা নেবে বলেই তাঁর বিশ্বাস।

