সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ। অবশেষে দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা পর ইডি দপ্তর থেকে বেরোলেন রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী তথা মধ্যমগ্রামের নবনির্বাচিত বিধায়ক রথীন ঘোষ। আজ, সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির আধিকারিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। দিনভর টানটান জেরার পর্ব চুকে যাওয়ার পর যখন তিনি বাইরে আসেন, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে ১০টা। জেরা শেষে বাইরে বেরিয়ে অবশ্য সংবাদমাধ্যমের সামনে খুব বেশি মুখ খুলতে চাননি এই প্রবীণ তৃণমূল নেতা। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে রথীন ঘোষ কেবল বলেন, “ওরা আইটি (IT) সংক্রান্ত কিছু নথিপত্র চেয়েছিল। সেই সমস্ত কাগজপত্র আমি ওদের কাছে জমা দিয়েছি। পরে ওঁরা আবার ডাকবেন বলে জানিয়েছেন।” রাজ্যের বহুল চর্চিত পুরনিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে এর আগেও একাধিকবার রথীন ঘোষকে তলব করেছিল ইডি। সাম্প্রতিককালেও জেরার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৃণমূলের এই হেভিওয়েট বিধায়ককে সিজিও কমপ্লেক্সে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রতিবারই তীব্র শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে হাজিরা এড়িয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এই মর্মে তাঁর আইনজীবীর তরফ থেকে চিঠি পাঠিয়ে ইডিকে অবগতও করা হয়েছিল। এদিকে পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলাতেই রাজ্যের অপর এক প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্ফতার করেছে ইডি এবং তিনি এই মুহূর্তে জেল হেপাজতে রয়েছেন। সুজিত বসুর এই পরিণতির পর স্বভাবতই রথীন ঘোষকে ঘিরে জল্পনার পারদ চড়তে শুরু করেছিল রাজনৈতিক মহলে। সেই আবহেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা ফের রথীনকে তলব করায় চাপ বাড়ছিল। শেষমেশ সোমবার আর আইনি জটিলতা না বাড়িয়ে সোজা সিজিও কমপ্লেক্সে সশরীরে হাজিরা দেন তিনি। তার পর থেকেই শুরু হয় ইডি কর্তাদের রুদ্ধদ্বার ম্যারাথন জেরা। ঘটনার প্রেক্ষাপট ঘাঁটলে দেখা যাবে, বছর তিন আগে রেশন দুর্নীতি মামলায় তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ইডির হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর এক চরম প্রশাসনিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সময় খাদ্য দপ্তরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব মধ্যমগ্রামের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বিধায়ক রথীন ঘোষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু মন্ত্রিত্বের তিলক কপালে জুটলেও, রথীন ঘোষের পিছু ছাড়েনি পুরনিয়োগ দুর্নীতির ছায়া (Municipal Recruitment Scam)। তদন্তকারীদের দাবি, গত ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মধ্যমগ্রাম পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান পদে ছিলেন রথীন ঘোষ। অভিযোগ উঠেছে, সেই সময়ে তাঁর দেওয়া সুনির্দিষ্ট সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই মধ্যমগ্রাম পুরসভায় সম্পূর্ণ বেআইনি ও অনৈতিক উপায়ে বিপুল পরিমাণ নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই ইডির আতসকাচের নীচে চলে আসেন তিনি এবং শুরু হয় জোরদার তদন্ত। এই নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্ত চলাকালীন, সদ্য সমাপ্ত ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে রথীন ঘোষকে সব মিলিয়ে মোট ৫ বার ডেকে পাঠিয়েছিল ইডি। কিন্তু সেই সময়ে তিনি নিজে প্রার্থী হওয়ায় এবং নির্বাচনের রকমারি দলীয় কাজে চূড়ান্ত ব্যস্ততার অজুহাত খাড়া করে প্রতিবারই ইডির সমন এড়িয়ে যান। গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের দিন দেখা যায়, সমস্ত বিতর্ককে উড়িয়ে দিয়ে মধ্যমগ্রাম কেন্দ্র থেকে পুনরায় জয়ী হয়েছেন তিনি। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পরেই ফের রথীনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কড়া সমন পাঠায় ইডি। তখনও তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। তবে সোমবার আর হাজিরা এড়াননি তিনি। ইডি সুত্রে খবর, দীর্ঘ ১১ ঘণ্টার এই ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর বয়ান পুঙ্খানুপুঙ্খ রেকর্ড করা হয়েছে এবং জমা নেওয়া হয়েছে তাঁর আয় ও সম্পত্তির আয়কর সংক্রান্ত যাবতীয় নথি। এখন দেখার, এই দীর্ঘ জেরার পর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়।