রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদলের প্রভাব এবার সরাসরি পড়ল সর্বোচ্চ প্রশাসনিক মহলে। দীর্ঘ প্রায় 15 বছর ধরে রাজ্যের প্রধান সচিবালয় ‘নবান্ন’-এর চূড়ায় নীল রঙের নামফলক শোভা পেত ৷ সোমবার সকালে তা পুরোপুরি বদলে গেল। নীলের পরিবর্তে সেখানে জায়গা করে নিল উজ্জ্বল গেরুয়া রংয়ের নতুন ফলক। বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর থেকেই একের পর এক সরকারি সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক বিন্যাসে বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। এবার সেই পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রতীক ফুটে উঠল নবান্নের শীর্ষদেশেই।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নানা স্তরে নীল-সাদা ছাপ মুছে ফেলার জল্পনা জোরালো হয়েছিল। ইতিমধ্যেই প্রায় আড়াই মাস অতিক্রান্ত। এই সময়ের মধ্যে নবান্ন ভবনটিকে রাতে গেরুয়া আলোয় মুড়ে ফেলার দৃশ্য দেখা গিয়েছে। একই ছবি দেখা গিয়েছে মহাকরণেও ৷ তবে ভবনের নিজস্ব পরিচিতিচিহ্ন বা কাঠামোগত উপাদানে সরাসরি হাত দেওয়ার ঘটনা এই প্রথম। এদিন সকাল হতেই নবান্ন চত্বরে কর্মীদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ে। তাঁদের উপস্থিতিতেই ভবনের একদম মাথায় আগের নীল ফলকটি নামিয়ে এনে বসিয়ে দেওয়া হয় নতুন গেরুয়া রঙের ফলক।
তৃণমূলের শাসনকালে রাজ্যজুড়ে নীল-সাদা রঙের একচ্ছত্র আধিপত্য চোখে পড়ত। শুধু নবান্ন কিংবা মহাকরণ নয়, অন্য সরকারি দফতর, উড়ালপুল, পুলিশ স্টেশন থেকে শুরু করে রাস্তার মোড়ের রেলিং কিংবা আলোর খুঁটি পর্যন্ত সবই সাজানো হয়েছিল নীল ও সাদা রঙের সংমিশ্রণে। এমনকী সরকারি লোগোতেও ছিল এই রঙের ছাপ। কিন্তু বাংলায় নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হতেই প্রশাসনিক মহলে শুরু হয়েছে সেই রঙের ধারাবাহিকতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
নবান্নর শীর্ষদেশের নামফলকটির রূপান্তরের নেপথ্যে বড় রাজনৈতিক বার্তা আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তবে কি খুব শীঘ্রই সুবিশাল নবান্ন ভবনটিও গেরুয়া রঙে সেজে উঠবে ? রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এমন সম্ভাবনাকে মোটেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য নবান্নের মূল ভবনের রং পরিবর্তন নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও বিবৃতি জারি করা হয়নি। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের ধারণা, ধাপে ধাপে পুরো ভবনের কায়া পরিবর্তন করার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
শুধু নবান্নের প্রশাসনিক ভবনই নয়, রঙের এই পরিবর্তন চোখে পড়তে পারে রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রেও। 2022 সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন সমস্ত সরকারি ও রাজ্য সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলির ইউনিফর্মের রং বদলে নীল-সাদা করেছিল। নতুন রাজনৈতিক আবহে সেই সিদ্ধান্তও বাতিলের পথে।
পরিবর্তন প্রসঙ্গে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করে শুভেন্দু অধিকারী আগেই জানিয়েছিলেন, 2022 সালের আগে ইউনিফর্মের রং যা ছিল, তাই ফিরতে চলেছে স্কুলগুলিতে। অর্থাৎ কেবল প্রশাসনিক ভবনই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্র থেকেও পূর্বতন জমানার রঙের পরিচিতি মুছে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে।
সবমিলিয়ে নবান্নের চূড়ায় নীল সরিয়ে গেরুয়া ফলক বসানোর ঘটনাটি স্রেফ একটা সাধারণ সংস্কার বা সৌন্দর্যায়নের কাজ নয়। এটিকে নতুন জমানার ক্ষমতার ঘোষণা এবং প্রশাসনিক দর্শনের বদল হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ ৷

