মহিলা সংরক্ষণের আড়ালে আসলে আসন পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’-এর মাধ্যমে গেরুয়া শিবিরের জন্য রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চক্রান্ত করছে মোদি সরকার ৷ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের তীব্র সমালোচনা করে সোশাল মিডিয়ায় লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তাঁর অভিযোগ, নারী সংরক্ষণ বিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করছেন ৷ এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর সরাসরি আক্রমণ এবং বাবাসাহেব আম্বেদকরের রচিত সংবিধানের পরিপন্থী বলেও তোপ দেগেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো ৷ সোশাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ বিবৃতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, “এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, প্রধানমন্ত্রী সারা দেশকে বিভ্রান্ত করার পথ বেছে নিয়েছেন ৷” গতকাল প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর ভাষণে মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর না-হওয়ার জন্য কংগ্রেস, তৃণমূল, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টিকে দুষেছেন ৷ এই বিরোধী দলগুলিকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন ৷ তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস-সহ ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের অন্য় দলগুলি মহিলা বিরোধী ৷ তৃণমূল বিরুদ্ধে তোলা এই বিরোধিতার অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ নিজের দলের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তৃণমূল নেত্রী জানিয়েছেন, রাজনীতিতে মহিলাদের উচ্চতর প্রতিনিধিত্বের পক্ষে তৃণমূল বরাবরই সওয়াল করে এসেছে ৷ এখন লোকসভায় তৃণমূলের নির্বাচিত সাংসদদের মধ্যে 37.9 শতাংশ মহিলা ৷ অন্যদিকে, রাজ্যসভায় তৃণমূলের তরফে 46 শতাংশ মহিলা সদস্যকে মনোনীত করা হয়েছে ৷ ফলে নারী সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতার কোনও প্রশ্নই ওঠে না-বলে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন ৷ কংগ্রেস-সহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলির মতো তৃণমূলও ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে আপত্তি রয়েছে ৷ এই বিষয়টি নিজের বিবৃতিতে খোলসা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তাঁর অভিযোগ, মহিলাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইছে মোদি সরকার ৷ আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এমনভাবে বদলে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে, যাতে অ-বিজেপি রাজ্যগুলির তুলনায় বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলি সংসদে অনেক বেশি প্রতিনিধিত্ব পায় ৷ একে ‘জেরিম্যান্ডারিং’ বা অন্যায্যভাবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের চক্রান্ত বলে উল্লেখ করে মমতা বলেন, “আমরা বাবাসাহেব আম্বেদকরের সংবিধান পরিবর্তন, দেশের বিভাজন এবং আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চক্রান্তের তীব্র বিরোধী ৷ এটি যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের উপর এক নগ্ন আক্রমণ ৷ এই ঘটনা আমরা নীরবে মেনে নেব না ৷” এই বিল কার্যকর করার সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ৷ তাঁর প্রশ্ন, সরকার যদি সত্যিই এই মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তরিক হত, তাহলে 2023 সালের 28 সেপ্টেম্বর নারী সংরক্ষণ বিল পাশ হওয়ার পর প্রায় তিন বছর কেন অপেক্ষা করল ? যখন দেশের একাধিক রাজ্যে নির্বাচন চলছে, ঠিক সেই সময়ে তড়িঘড়ি কেন এই বিষয়টিকে সামনে আনা হচ্ছে ? এবং কেনই বা একে ডিলিমিটেশনের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে ?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “তৃণমূল কয়েক দশক ধরে মহিলাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে ৷ কিন্তু বর্তমান শাসকদল, যারা মহিলাদের সম্মান করতে বা বুঝতে জানে না, তাঁদের কাছ থেকে আমাদের নীতিবাক্য বা জ্ঞান শোনার কোনও প্রয়োজন নেই ৷” বিবৃতির শেষে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীক্ষ্ণ কটাক্ষ, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পরের বার যখন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, তখন সংসদের অধিবেশনে দাঁড়িয়ে তা করার সাহস দেখাবেন ৷ কারণ সেখানে আপনাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে এবং জবাবদিহি করতে হবে ৷ গতকাল আপনি যা করেছেন, তা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত এবং দ্বিচারিতাপূর্ণ ৷” প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তাঁর আরও সংযোজন, “আপনি বুঝতে পারছেন, ক্ষমতা আপনার হাতের মুঠো থেকে ফস্কে বেরিয়ে যাচ্ছে ৷ আর সেই ক্ষমতাকে আরও কিছুদিন আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য আপনি যে কোনও স্তরে নামতে প্রস্তুত ৷” আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর করাকে ঘিরে রাজনীতির উত্তাপ তুঙ্গে ৷

