রাজ্যের সরকারি দফতরগুলিতে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে এবং কাজের গতি ও স্বচ্ছতা বাড়াতে একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা জারি করল নবান্ন । মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশের পর, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যসচিব গত ১৮ মে একটি বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তি (নং 130-সিএস/2026) জারি করেছেন । রাজ্যের সমস্ত দফতরের প্রধান এবং জেলাশাসকদের কাছে পাঠানো এই নির্দেশিকায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এবার থেকে সরকারি কাজে যথেচ্ছ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন এবং ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে । রাজ্য সরকারের সমস্ত দফতর, ডিরেক্টরেট, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা (PSU), বোর্ড, কর্পোরেশন এবং সরকারি অর্থপুষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে অবিলম্বে এই নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে । বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে মোট সাতটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে । প্রথমত, সরকারি কাজকর্ম এবং পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এখন থেকে ভিডিয়ো কনফারেন্স, ভার্চুয়াল বৈঠক এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সর্বাধিক ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হবে । কাজের গুণমান এবং দক্ষতা যাতে কোনওভাবেই ব্যাহত না-হয়, সেদিকে খেয়াল রেখে যতটা সম্ভব ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । দ্বিতীয়ত, সরকারি আধিকারিক এবং কর্মীদের অপ্রয়োজনীয় সফর বা ভ্রমণ কমানোর কথা বলা হয়েছে । এর পরিবর্তে যাতায়াতের জন্য গণপরিবহণ, কারপুলিং এবং পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যান (ইলেকট্রিক ভেহিকল) ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে । শুধু যাতায়াত নয়, সরকারি অফিসগুলিতে দৈনন্দিন বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সাশ্রয় এবং শক্তি সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে । তৃতীয়ত, প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা এবং গতি আনতে ‘পেপারলেস’ (কাগজবিহীন) কাজকর্ম এবং ‘ই-অফিস’ ব্যবস্থাকে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । এর ফলে একদিকে যেমন কাগজের ব্যবহার কমবে, তেমনই অন্যদিকে এড়ানো যাবে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় । পাশাপাশি, এই নির্দেশিকায় আত্মনির্ভরতার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সরকারি কেনাকাটায় এখন থেকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত বা দেশীয় পণ্যকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে । সরকারি স্তরে ‘স্বদেশি’ উদ্যোগকে আরও বেশি করে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে নবান্নের এই নির্দেশিকায় ।
চতুর্থত, পরিবেশ রক্ষায় টেকসই ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে । বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি দফতরগুলিকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে । পাশাপাশি, স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা সম্পর্কে সচেতনতা প্রসারের কথাও বলা হয়েছে নির্দেশিকায় । স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভোজ্য তেল ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজকে উৎসাহ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন । এই নির্দেশিকা যাতে কেবল খাতায়-কলমে সীমাবদ্ধ না-থাকে, তার জন্য কঠোর সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে নবান্ন । নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, প্রতিটি রাজ্য সরকারি দফতর এবং জেলা প্রশাসনকে আসন্ন 2026-27 অর্থবর্ষের জন্য একটি বিস্তারিত ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ বা কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হবে । এই পরিকল্পনায় তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা এবং তার পরিমাপযোগ্য ফলাফলের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে । আগামী ২২ মে, 2026-এর মধ্যে এই কর্মপরিকল্পনা মুখ্যসচিবের কার্যালয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । শুধু পরিকল্পনা জমা দেওয়াই নয়, কাজের অগ্রগতি কতটা হল তা বোঝাতে আগামী 1 জুলাই, 2026 থেকে প্রতি মাসে একটি করে মাসিক রিপোর্টও পাঠাতে হবে নবান্নে । রাজ্যের সমস্ত অতিরিক্ত মুখ্যসচিব, প্রধান সচিব, সচিব এবং জেলাশাসকদের এই নির্দেশকে ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ দিয়ে নিজেদের অধীনস্ত সমস্ত দফতর ও সংস্থায় অবিলম্বে কার্যকর করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । প্রশাসনিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, নবান্নের এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে সরকারি কোষাগারের বিপুল অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে ।


