​উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়িতে দেশের নতুন ফৌজদারি আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সহজ ও স্পষ্টভাবে সচেতন করতে আয়োজিত হল এক বিশাল আইনি প্রদর্শনী । শুক্রবার এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ৷ এই উপলক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পূর্বতন সরকারের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি, রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তারও উল্লেখ করেন শাহ ৷ 21 অগস্ট থেকে 26 আগস্ট পর্যন্ত কাওয়াখালি ময়দনে ‘5টি স্তম্ভ: পরিবর্তিত বিচারব্যবস্থা’ শীর্ষক এই ‘ন্যায় সংহিতা প্রদর্শনী’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে । পুরনো ভারতীয় দণ্ডবিধি (1860), ফৌজদারি কার্যবিধি (1973) এবং ভারতীয় সাক্ষ্য আইন (1872)-এর স্থান নেওয়া ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (2023)’, ‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (2023)’ এবং ‘ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম (2023)’-এর মূল বৈপ্লবিক পরিবর্তনগুলি সাধারণ নাগরিকদের সামনে তুলে ধরাই এই আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য । অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখার পাশাপাশি পরবর্তীতে কাওয়াখালি ময়দানে পৌঁছে প্রদর্শনীর বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ । উদ্বোধনী মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক, স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজু বিস্তা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন, রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, আইবি ডিরেক্টর মহেশ দীক্ষিত এবং রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহানির্দেশক সিদ্ধনাথ গুপ্তা-সহ ন্যায় বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব । শিলিগুড়ি ছাড়াও জলপাইগুড়ি, ইসলামপুর এবং দার্জিলিংয়ের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের এই মেগা প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়েছে । ​এদিন খোলা মঞ্চ থেকেই অমিত শাহ বলেন, “সারা দেশজুড়ে এই নতুন ন্যায় সংহিতা কার্যকর করার কাজ শুরু হয়ে গেছে । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় এর নোটিফিকেশন জারি করেননি । তার কারণ হল – যেমনই ন্যায় সংহিতা প্রয়োগ হবে, সাথে সাথে সিন্ডিকেট, কাটমানি, তোলাবাজি এবং ভয়ের সাম্রাজ্য ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে ।” তিনি আরও যুক্ত করেন, “বাংলার নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলার জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আপনারা আমাদের উপর ভরসা রাখুন, আমরা ভয়ের নয়, ভরসার সরকার গড়ব । শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব সামলেই যে প্রথম ফাইলে সাইন করেছেন, তা হল আমাদের তিন নতুন ন্যায় সংহিতা কার্যকর করে ব্রিটিশ আমলের পুরনো আইন সরানোর ফাইল । আর সেখান থেকেই ভয়ের বদলে ভরসার কাজ শুরু হয়ে গেছে ।” ​ভাষণে নতুন আইন প্রয়োগের নানা ইতিবাচক দিক এবং প্রশাসনিক সাফল্যের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী । অতীতে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বাংলায় অ্যাসিড হামলা, বোমার বিস্ফোরণ কিংবা আরজি কর, সন্দেশখালি, দুর্গাপুর মেডিক্যাল কলেজ ও দক্ষিণ কলকাতা ল কলেজের মতো ঘটনায় কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন । তবে আইন ও সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় 15 বছর পর ফের আইনের শাসন সুনিশ্চিত হবে বলে তিনি গভীর বিশ্বাস ব্যক্ত করেন । নতুন আইনে প্রযুক্তির প্রয়োগ সম্পর্কে অমিত শাহ উল্লেখ করেন, “আমরা নতুন ন্যায় সংহিতায় প্রযুক্তির ব্যবহার করেছি, যাতে পুলিশ তদন্তের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রযুক্তিভিত্তিক তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করতে পারে । এর ফলে বিচারের গতি বাড়বে ।” জিরো এফআইআর ও ই-এফআইআর ব্যবস্থার সুফলের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছোট ছোট মেয়েরা, বোনেরা, ব্যাংকিং প্রতারণার শিকার ব্যক্তিবর্গ এবং দেশের যে কোনও প্রান্তে কর্মরত বাঙালি নাগরিকরা নিজ নিজ এলাকার থানায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিযোগ স্থানান্তরিত হওয়ার সুবিধা পাবেন । ​বক্তব্যের শেষাংশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নারী ও শিশুদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি জানান, ছয় বছরের বেশি সাজা থাকা সমস্ত ধারায় এফএসএল ভিজিট ও রিপোর্ট জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । প্রযুক্তি, স্বচ্ছতা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা, এই তিনটি দিয়ে পুরো বিচার ব্যবস্থা বদলাতে চলেছে বলে উল্লেখ করে তিনি নিশ্চিত করেন যে, যে কোনও এফআইআর হলে মাত্র তিন বছরের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে । এ ছাড়া সিএএ আইন বাস্তবায়ন, অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, তোলাবাজি মুক্ত হেল্পলাইন নম্বর (155334) চালু, কৃষকদের সহায়তা বৃদ্ধি, সপ্তম বেতন কমিশন ও ডিএ সংক্রান্ত ক্যাবিনেট অনুমোদন এবং নারীদের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা তিনি তুলে ধরেন । শিলিগুড়ির কাওয়াখালি ময়দানে পাঁচদিন ধরে চলা এই সচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখে বাংলায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সকলকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ।