সদ্য সমাপ্ত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের পর আগামিদিনে দলের রাজনৈতিক এবং আইনি রণকৌশল কী হবে, তা চূড়ান্ত করতে কালীঘাটে নিজের বাসভবনে এক বিশেষ জরুরি বৈঠকে করলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতা এবং সাংসদরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় উভয়েই আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপি ও জাতীয় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের অভিযোগ, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি। এমনকি, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে অঘোষিত ‘সুপার এমার্জেন্সি’ বা চরম জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন তৃণমূল নেত্রী। বৈঠকে জাতীয় স্তরে তৃণমূলের অবস্থান নিয়েও এদিন আলোচনা হয়। বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সংখ্যা 28 (বসিরহাটের সাংসদ হাজি নুরুল ইসলামের প্রয়াণে সংখ্যাটি এক কমেছে) এবং রাজ্যসভায় ঘাসফুল শিবিরের রয়েছেন 13 জন প্রতিনিধি। এদিনের বৈঠকে এই জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আগামিদিনের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ দিয়েছেন মমতা। তাঁর কথায়, রাজ্যে ও দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে এবং বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে রাখার জন্য সবরকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বৈঠকে শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘এবারের নির্বাচন মোটেও সহজ ছিল না, দল একটা অত্যন্ত কঠিন লড়াই লড়েছে।’’ বৈঠকে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন যে, ভোট গণনার দিন গণনাকেন্দ্রের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল গেরুয়া শিবির।
এই প্রসঙ্গের সূত্র ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, গণনার দিন তাঁর কাউন্টিং এজেন্টকেও চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে মমতা জানান, তিনি বিজেপির এই অগণতান্ত্রিক আচরণের মুখোশ সাধারণ মানুষের সামনে খুলে দিতে চেয়েছিলেন। গোটা নির্বাচন পর্ব জুড়েই এক চরম দমবন্ধ করা ‘সুপার এমার্জেন্সি’-র মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি দলীয় নেতৃত্বকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, আগামিদিনে বিজেপির নিশ্চিত পতন ঘটতে চলেছে।
কালীঘাটের এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকে স্বভাবসিদ্ধ আক্রমণাত্মক মেজাজে ধরা দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াই নিছকই কোনও রাজনৈতিক দল বা বিজেপির বিরুদ্ধে ছিল না। এই লড়াই ছিল কেন্দ্রের গোটা শক্তি ও তদন্তকারী এজেন্সির বিরুদ্ধে। ভোট গণনার দিন কেন্দ্রীয় বাহিনীর (সিএপিএফ) ভূমিকা নিয়ে তিনি চরম উষ্মা প্রকাশ করেন। অভিষেকের অভিযোগ, গণনাকেন্দ্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জওয়ানরা অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছেন। তৃণমূলের কাউন্টিং এজেন্টদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি, প্রার্থীদের পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া এবং তা ছিঁড়ে ফেলার মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন তিনি। ভোট লুঠ ও ইভিএম কারচুপি নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক দাবি করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, কীভাবে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার বা ভোট লুঠ করা হয়েছে, সেই প্রকৃত সত্য একদিন দেশের মানুষের সামনে ঠিকই প্রকাশ পাবে। ইভিএম মেশিনের কারচুপির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানান, ভোটগ্রহণের পর ইভিএম এবং 17-সি ফর্মের হিসাবের মধ্যে বিস্তর গরমিল লক্ষ্য করা গিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল, গণনার সময় ইভিএম-এর ব্যাটারিও নাকি 90 শতাংশের বেশি চার্জড অবস্থায় দেখা যাচ্ছিল। এছাড়াও তৃণমূলের কাছে খবর রয়েছে যে, বিজেপির লোকজন কেন্দ্রীয় বাহিনীর পোশাক পরে বা ছদ্মবেশ ধরে বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালিয়েছে। শুধু তাই নয়, বিরোধী শিবিরের এজেন্টদের মনোবল একেবারে ভেঙে দেওয়ার জন্য মনস্তাত্ত্বিক খেলাও খেলা হয়েছে বলে অভিযোগ অভিষেকের। তাঁর দাবি, গণনার দিন তৃতীয় রাউন্ডের শেষে ইচ্ছাকৃতভাবে বিজেপিকে 200-র বেশি আসনে এগিয়ে দেখানো হয়েছিল, যাতে তৃণমূল এজেন্টরা হতাশ হয়ে পড়েন। ভবানীপুর এলাকাতেও ডিআইসিও-কে ঢুকতে বাধা দেওয়া এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি জানান।
পরিশেষে, সমস্ত প্রতিকূলতার কথা স্বীকার করে নিয়েও দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে এক কড়া এবং ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, তৃণমূল অতীতে এর চেয়েও অনেক খারাপ সময় দেখেছে এবং মানুষের আশীর্বাদে তা পার করে এসেছে। তাই বর্তমান এই চরম রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দলীয় কর্মীদের নিজেদের লক্ষ্যে ‘অনড়’ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

