নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং নারী নির্যাতনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে দু’টি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করল রাজ্য সরকার ৷ সোমবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই দু’টি কমিশন গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ৷ সেই সঙ্গে রাজ্য পুলিশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ফিরছেন দুঁদে আইপিএস দময়ন্তী সেন ৷ নারী নির্যাতনের জন্য তৈরি তদন্ত কমিশনে মেম্বার সেক্রেটারি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ-কাণ্ডের তদন্তকারী এই আইপিএস আধিকারিক ৷ এ দিন নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, কলকাতা হাইকোর্টের দু’জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে দু’টি কমিশন গঠন করা হয়েছে ৷ একটি কমিশন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির তদন্ত করবে ৷ যার নেতৃত্বে অর্থাৎ, চেয়ারপার্সন নিযুক্ত করা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুকে ৷ আর নারী নির্যাতনের তদন্তের জন্য গঠিত কমিশনের চেয়ারপার্সন করা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়কে ৷ 1 জুন থেকে এই দুই কমিশন তাদের কাজ শুরু করবে ৷ এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, স্বরাষ্ট্রসচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ, রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা এবং দুই বর্ষীয়ান আইপিএস আধিকারিক দময়ন্তী সেন ও কে জয়রামন ৷ মুখ্যমন্ত্রী জানান, নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যের পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রকাশ করে এই দু’টি বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ৷ সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতেই এই পদক্ষেপ ৷

নারী ও শিশু সুরক্ষায় বিশেষ কমিশন

রাজ্যে মহিলাদের ওপর হওয়া লাগাতার নির্যাতনের তদন্তের জন্য গঠিত কমিশনের নেতৃত্বে থাকছেন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায় ৷ এই কমিশনের মেম্বার সেক্রেটারি করা হয়েছে আইপিএস আধিকারিক দময়ন্তী সেনকে ৷ তফশিলি জাতি, উপজাতি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুকন্যাদের উপর হওয়া দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও অপরাধের তদন্ত করবে এই কমিশন ৷ ভোট পরবর্তী হিংসার শিকার হওয়া মহিলারা এই কমিশনে অভিযোগ জানাতে পারবেন ৷ পাশাপাশি, এর আগেও মহিলাদের উপর হওয়া ধর্ষণ-সহ অন্যান্য সব অপরাধের অভিযোগ জানানো যাবে ৷ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “বাংলায় যেভাবে সন্দেশখালি, হাঁসখালি, ময়নাগুড়ি থেকে শুরু করে কামদুনি, পার্ক স্ট্রিট, কসবা ল’কলেজ ও দুর্গাপুরের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, রামপুরহাটে এসটি শিশুকন্যার উপর নির্যাতন, বগটুইতে যেভাবে মুসলিম সংখ্যালঘু মহিলাদের আগুনে পোড়ানো হয়েছে— এই সবকিছুর বিরুদ্ধে তদন্ত করবে এই কমিশন ৷ পাশাপাশি, 2021 সালের ভোট পরবর্তী হিংসার পর যেভাবে মহিলাদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা— সে সবকিছুর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হবে ৷ এই জন্যই এই কমিশন গঠন করা হয়েছে ৷”

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির তদন্তে কড়া পদক্ষেপ

আরেকটি কমিশনটি গঠন করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির তদন্তের জন্য ৷ এই কমিশনের চেয়ারপার্সন নিযুক্ত হয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু ৷ মেম্বার সেক্রেটারি হিসাবে দায়িত্ব সামলাবেন এডিজি র‍্যাঙ্কের প্রবীণ আইপিএস অফিসার কে জয়রামন ৷ মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিগত বছরগুলিতে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের একাধিক সামাজিক প্রকল্প ও পরিকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের টাকা ব্যাপক হারে তছরুপ করা হয়েছে ৷ কাটমানি এবং ঘুষের বিনিময়ে পরিষেবা দেওয়ার যে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে, তা সমূলে উৎপাটন করতেই এই কমিশন গঠন করা হয়েছে ৷ এ প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমি আশা করব, এই কমিটি তার ফাংশনিং শুরু করার ত্রিশ দিনের মধ্যেই রেকমেন্ডেশনগুলি দিতে শুরু করবে ৷ আমরা সেই ভিত্তিতে পুলিশের পক্ষ থেকে এফআইআর লজ করব ৷ বিএনএস (BNS)-এর অন্তর্গত যে সেকশন আছে, সেই ধারা অনুযায়ী আমরা অ্যাকশনও নেব ৷ গভর্মেন্টের ফান্ড, এক্সচেকার থেকে যা দুর্নীতি হয়েছে, তা রিকভারি করার চেষ্টা হবে ৷” তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, “আমফানের ক্ষতিপূরণ, মিড-ডে মিল, আবাস যোজনা, পিএইচই (PHE) এবং মনরেগার মতো প্রকল্পে হওয়া দুর্নীতির পাশাপাশি সরকারি আধিকারিক, পঞ্চায়েত প্রধান, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত সদস্য থেকে শুরু করে পুরসভার কাউন্সিলর বা ব্রোকার— সকলের বিরুদ্ধেই এই কমিশনে অভিযোগ জানানো যাবে ৷

অভিযোগ জানানোর সহজ পদ্ধতি

কমিশনের কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সাধারণ মানুষকে অভিযোগ জানাতে কলকাতায় আসার কোনও প্রয়োজন নেই ৷ দময়ন্তী সেনের নেতৃত্বে একটি ডেডিকেটেড পোর্টাল, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং ই-মেইল চালু করা হবে ৷ মেম্বার সেক্রেটারি স্বয়ং বিভিন্ন থানা ও জেলায় স্পট ভিজিট করবেন এবং গ্রাম ও ওয়ার্ড স্তরে জনশুনানির আয়োজন করবেন ৷ পুরনো পড়ে থাকা জিডি, এফআইআর থেকে শুরু করে মানবাধিকার কমিশন, শিশু ও নারী অধিকার কমিশন এবং এসসি-এসটি কমিশনের সুপারিশগুলিও প্রাথমিকভাবে খতিয়ে দেখা হবে ৷ তবে সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বা কেন্দ্রীয় এজেন্সির অধীনে থাকা নির্দিষ্ট কিছু মামলা এর আওতার বাইরে থাকবে ৷ প্রয়োজনে পুরনো চার্জশিট রি-ওপেন করে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট দিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ৷ রাজ্য সরকারের তরফ থেকে এই দুই কমিশনকে সবরকম পরিকাঠামোগত এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে ৷ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সবশেষে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে আবেদন জানিয়ে বলেন, “আমি মিডিয়ার মাধ্যমে সমগ্র বাংলার জনগণকে বলব, পূর্ণ সহযোগিতা করুন ৷ আপনাদের কাছে যে তথ্য আছে, যে ডকুমেন্টস বা প্রমাণ আছে, তা এই কমিশনকে পাঠান এবং আপনাদের যে প্রত্যাশা রয়েছে, তা পূরণ করার কাজ এই সরকার করবে ৷”