পার্ক সার্কাসে অশান্তি এবং কর্তব্যরত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর হামলার ঘটনায় এবার কড়া অবস্থান গ্রহণ করল রাজ্য সরকার ৷ গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে রাস্তায় নেমে তাণ্ডব, জমায়েত করে ধর্মীয় স্লোগান দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর পাথর ছোড়ার ঘটনাকে কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না-বলে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং এই ধরনের সমাজবিরোধী কার্যকলাপ কঠোর হাতে দমনে পুলিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ‘ফ্রি হ্যান্ড’ বা স্বাধীনভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷ রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকে এদিন স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, গণতান্ত্রিক দেশে যে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজেদের অভাব-অভিযোগ জানানো ও প্রতিবাদ করার বা দাবি পেশ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই দাবি আদায়ের পথ হতে হবে সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত এবং আইনসম্মত। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। প্রয়োজনে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা ব্যক্তিরা সরাসরি সংশ্লিষ্ট এলাকার থানার ওসি (OC) বা আইসি (IC)-দের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু আচমকা কিছু মানুষকে সংঘবদ্ধ করে, রাস্তায় নেমে ধর্মীয়-উস্কানিমূলক স্লোগান দিয়ে পাথর ছোড়ার মতো হিংসাত্মক ও প্ররোচনামূলক ঘটনা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই প্রসঙ্গে কাশ্মীরের উদাহরণ টেনে কড়া বার্তায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “কাশ্মীরেও এখন পাথর ছোঁড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে । আমার মনে হয় কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গেও এই ধরনের ঘটনা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া খুব দরকার।” রবিবার ছুটির দুপুরে আচমকাই উতপ্ত হয়ে ওঠে পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্ট ক্রসিং ৷ রাজ্যে বুলডোজ়ার অভিযানের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিষয়ের প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ রাস্তায় নামেন। ক্রমশ সেই বিক্ষোভ বড় আকার নেয় ৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও র্যাফ। ভিড়কে ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে পুলিশ ৷
পার্ক সার্কাসের ওই ভয়াবহ তাণ্ডবে কলকাতা পুলিশের একাধিক পদস্থ আধিকারিক এবং সিআরপিএফ (CRPF)-এর বেশ কয়েকজন জওয়ান গুরুতর আহত হয়েছেন। উন্মত্ত জনতার ছোড়া পাথরের আঘাতে যাঁরা জখম হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন চিত্রদীপ পাণ্ডে, ইন্সপেক্টর রাজেশ কুমার সিং, এএসআই, কনস্টেবল শাহজাদা শেখ এবং সিভিক ভলান্টিয়ার অনির্বাণ মজুমদার। এছাড়া আরও দু’জন সিআরপিএফ জওয়ানও এই ঘটনায় জখম হয়েছেন ৷ নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করতে এবং সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে এই পুলিশকর্মী ও জওয়ানরা যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, প্রশাসন তার ভূয়সি প্রশংসা করেছে ৷ আহত এই পুলিশকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে এবং তাঁদের মনোবল অটুট রাখতে সরকারের তরফ থেকে পূর্ণ সমর্থনের কথা জানানো হয়েছে ৷ পুলিশ বাহিনীকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে যে, মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নগরপাল তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন ৷ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশকে সম্পূর্ণ ভয়মুক্ত হয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷ যারা এই ধরনের হিংসায় মদত দিচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্যেও এদিন চরম হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে ৷ মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “কেউ যদি মনে করেন আগের সরকার বা আগের নিয়মের মতো পুলিশ বা ফোর্সের হাত-পা বেঁধে রেখে দেওয়া হবে, তাহলে তারা ভুল করবেন। জিরো টলারেন্স (Zero Tolerance) নীতি গ্রহণ করা হয়েছে ৷” এই ধরনের ভাঙচুর, গুণ্ডাগিরি এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপকে কোনওভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। পুলিশ মন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, “একটা পুলিশের গায়েও যদি হাত পড়ে, এই সরকার তার আইন প্রয়োগ করে যতদূর যেতে হয় যাবে। শুধু গ্রেফতার নয়, দোষীদের চূড়ান্ত সাজা বা কনভিকশন (Conviction) নিশ্চিত করা পর্যন্ত কড়া নজরদারি চালানো হবে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, অপরাধী কোনও রাজনৈতিক দল করে, কোন ধর্মের বা সম্প্রদায়ের মানুষ, অথবা সে কতটা প্রভাবশালী— আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসব একেবারেই দেখা হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “বাংলায় এখন ভয় আউট, ভরসা ইন।” পুলিশ আধিকারিকদের তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে নির্ভীকভাবে অন-স্পট (on-spot) অ্যাকশন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷ কলকাতা পুলিশের দক্ষতা এবং আধুনিকীকরণের উপর জোর দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷
ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় কড়া পদক্ষেপ শুরু করেছে প্রশাসন ৷ পার্ক সার্কাসের অশান্তির ঘটনায় তদন্তকারী আধিকারিকরা ইতিমধ্যে ৪০ জনকে গ্রেফতার করেছেন। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ৪০ কোম্পানি প্যারামিলিটারি ফোর্স বা কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রস্তুত রাখার চিন্তাভাবনাও চলছে, যাতে প্রয়োজনে পুলিশের কোনও ঘাটতি না হয়। সবমিলিয়ে প্রশাসনের তরফ থেকে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছে এবং দুষ্কৃতীদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এটাই এই ধরনের শেষ ঘটনা। রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার যে কোনও অপচেষ্টা এরপর থেকে কঠোরতম হাতে দমন করবে পুলিশ প্রশাসন।

