আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বড় পদক্ষেপ করল লালবাজার । কলকাতা পুলিশের অধীনস্থ সমস্ত থানাকে বকেয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা দ্রুত কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও বহু পরোয়ানা কার্যকর করা হয়নি । সেই কারণেই এবার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে লালবাজার । স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যাঁদের নামে পরোয়ানা রয়েছে তাঁদের গ্রেফতার করতে হবে । আর যদি কোনও কারণে তা করা সম্ভব না হয়, তবে কেন সম্ভব হয়নি এবং কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে, তার বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে লালবাজারে । সূত্রে খবর, শহরের বিভিন্ন থানায় বহুদিন ধরে বেশ কিছু গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলে রয়েছে । নির্বাচনের আগে সেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রশাসন । কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যাঁদের নামে পরোয়ানা রয়েছে তাঁরা পলাতক অবস্থায় থেকে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন । নির্বাচন চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই কড়া পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে ।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করার বিষয়ে কড়া নির্দেশ দিয়েছিল । কমিশনের সেই বার্তার পরই এবার লালবাজারের তরফেও প্রায় একই মর্মে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে । তবে শুধু জামিন অযোগ্য পরোয়ানার ক্ষেত্রেই নয়, জামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানার ক্ষেত্রেও কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে, তা বিস্তারিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানাগুলিকে । লালবাজার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিটি থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাদের এলাকায় থাকা সমস্ত বকেয়া পরোয়ানার তালিকা তৈরি করতে হবে । সেই তালিকা অনুযায়ী দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করার চেষ্টা করতে হবে । যদি কোনও ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে খুঁজে পাওয়া না যায় বা অন্য কোনও কারণে গ্রেফতার সম্ভব না হয়, তবে সেই কারণ উল্লেখ করে লিখিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে । পুলিশের একাংশের মতে, নির্বাচনের সময় এই ধরনের পরোয়ানা কার্যকর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । কারণ, যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বা আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও যাঁরা ধরা পড়েননি, তাঁদের অনেক সময় নির্বাচনী অশান্তি বা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হতে পারে । সেই সম্ভাবনাকে আগেভাগেই রুখতে চায় পুলিশ-প্রশাসন । এছাড়াও, পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও জোর দেওয়া হয়েছে । লালবাজারের তরফে জানানো হয়েছে, দায়িত্ব পালনের সময় সকল পুলিশকর্মীকে সরকারি নিয়মবিধি মেনে চলতে হবে । পুলিশ সূত্রে খবর, সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কয়েক জন পুলিশকর্মী নির্দিষ্ট নিয়মকানুন যথাযথভাবে মানছেন না । এই পরিস্থিতিতে প্রত্যেককে সতর্ক করা হয়েছে এবং স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনোরকম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না । সমাজমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আগের নির্দেশিকা মেনে চলার কথা পুনরায় মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে । কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশকর্মীদের সমাজমাধ্যমে আচরণ সংক্রান্ত 15 দফা নির্দেশিকা জারি করেছিলেন । সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বা পুলিশের পোশাকে থেকে কোনও ধরনের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করা যাবে না এবং এমন কোনও পোস্ট করা যাবে না, যা পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে । পরবর্তীতে রাজ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি চালু হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে সুপ্রতিম সরকারকে সরিয়ে কলকাতার নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় অজয় নন্দকে । নতুন কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পরও আগের সেই সমাজমাধ্যম সংক্রান্ত নির্দেশিকা মেনে চলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে । সোমবার লালবাজার থেকে জারি হওয়া নির্দেশিকাতেও সেই বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে । পুলিশ প্রশাসনের মতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব বজায় রাখা-এই দুই বিষয়ই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ । তাই একদিকে যেমন বকেয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা দ্রুত কার্যকর করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে পুলিশকর্মীদের আচরণ ও দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রেও কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে । সব মিলিয়ে, ভোটের আগে কোনোরকম ঢিলেমি বরদাস্ত করা হবে না-এই বার্তাই স্পষ্ট করে দিল লালবাজার । প্রশাসনের মতে, আইনের শাসন বজায় রাখতে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করতে এই ধরনের কড়া পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ।