তারাতলায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর নির্মাণকাজের গাফিলতি রুখতে নবান্ন থেকে একগুচ্ছ নজিরবিহীন ও কড়া সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, গোটা কলকাতা পুরনিগম এলাকাতে যত নির্মীয়মাণ ভবন রয়েছে এবং বিশেষ করে জলাশয় বুজিয়ে আগের সরকারের আমলে যেসব প্রকল্পের কাজ চলছে, আগামী 31 জুলাই পর্যন্ত সেগুলোর কাজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে । এই স্থগিতাদেশ চলাকালীন পিডব্লিউডি, সিভিল ডিফেন্স, ফায়ার ব্রিগেড, কলকাতা পুলিশ এবং কেএমসি-র প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ মেগা অডিট টিম গঠন করা হবে । মুখ্যসচিবের গাইডেন্সে তৈরি হওয়া এই টিম প্রতিটি সাইটের বিল্ডিং প্ল্যান এবং স্পট ভিজিট করে বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করবে । কলকাতা মেট্রোর কাজ এবং কলকাতা পোর্ট এরিয়ার যে সমস্ত লিজ জমিতে কাজ চলছে, তাকেও এই অডিটের আওতাভুক্ত করা হয়েছে । অডিটে যাদের সমস্ত কাগজপত্র এবং নির্মাণশৈলী নির্ভুল প্রমাণিত হবে, একমাত্র তারাই আগামী 1 আগস্ট থেকে পুনরায় কাজ শুরু করার ছাড়পত্র পাবে । তবে হাসপাতাল বা দমকলের মতো জরুরি পরিষেবামূলক নির্মাণকাজ এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকছে বলে তিনি জানিয়েছেন । এদিন ভর দুপুরেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে তারাতলার হাইড রোডের কাছে নির্মীয়মাণ গোডাউন । আর সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের জেরে ত্রাহি ত্রাহি রব গোটা এলাকায় । ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে পড়েন ওই নির্মীয়মাণ গোডাউনে কর্মরত প্রায় 30-35 জন শ্রমিক । খবর পেয়েই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকল, কলকাতা পুলিশ, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং সিভিল ডিফেন্স । পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে দ্রুত উদ্ধারকাজে নামানো হয় সেনা ও এনডিআরএফ-কে । গোটা এলাকার পরিস্থিতি নিজে চোখে খতিয়ে দেখতে দ্রুত সেখানে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । ঘটনাস্থল থেকে ফিরে নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন এবং একাধিক কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন । এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রসঙ্গে উদ্ধারকাজ থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ অডিট পদক্ষেপের কথা বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন তিনি । কীভাবে এই দুর্ঘটনার খবর আসার পর থেকে তার সরকার কাজ করেছে সে বিষয়েও তথ্য দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ।

নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উদ্ধারকাজের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, “দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু হয়েছে । 21 জন শ্রমিককে উদ্ধার করা গিয়েছে । যার মধ্যে তিনজন মৃত । আহত 18 । তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে । এখনও 10-15 জন আটকে রয়েছেন ।” তিনি আরও জানান যে, বেলা 12টা 7 মিনিটে এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে এবং খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন । সিভিল ডিফেন্স, পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেড প্রথমেই স্থানীয়দের সাহায্যে উদ্ধারকাজ শুরু না-করলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও দীর্ঘ হতে পারত । পরবর্তীতে ধ্বংসস্তূপের ভয়াবহতা পর্যালোচনা করে দুপুর আড়াইটে নাগাদ মুখ্যসচিবের সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে সেনা ডাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । তিনটে বেজে পনেরো মিনিটের মধ্যে সেনাবাহিনী এবং এনডিআরএফ পুরো উদ্ধারকাজের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয় । আহতদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ 24 পরগনার সিএমওএইচ-এর তত্ত্বাবধানে 20টি অ্যাম্বুলেন্সকে কাজে লাগানো হয় । কলকাতা পুলিশের তৈরি করা গ্রিন চ্যানেলের মাধ্যমে আহতদের এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে 10-11 জনের চিকিৎসা চলছে । ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা বাকি শ্রমিকদের সঙ্গে উদ্ধারকারীরা যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছেন এবং ভেতরে জল ও অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন । দুর্ঘটনাগ্রস্ত গোডাউনটির বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের 17 জানুয়ারি এই বিল্ডিং প্ল্যানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল । জমিটির মালিক হল এসএমপিএ এবং লিজ নিয়ে শ্রী শম্ভুনাথ বেহারা অর্থাৎ বেহারা ব্রাদার্স সেখানে এই কাজ চালাচ্ছিল । প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে কেএমসি-র ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়েছেন যে, প্ল্যানটিতে বড়সড় ত্রুটি ছিল । মুখ্যমন্ত্রী নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বুঝতে পেরেছেন যে, ভারী বৃষ্টি বা মাটি নরম হওয়ার কারণে এই ধস নামেনি । বরং কাঠামোগত ত্রুটির কারণে নাট-বল্টু ফসকে গিয়ে পুরো লোহার বিশাল কাঠামো উল্টে গিয়ে ভেঙে পড়েছে ।