কলকাতার তারাতলা এলাকায় বুধবার এক নির্মীয়মাণ কারখানার শেড ভেঙে পড়ার ঘটনায় লোহার কাঠামোর নিচে চাপা পড়েছেন একাধিক শ্রমিক। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের নানা খুঁটিনাটি বিষয় তদারকি করতে বিকেল পৌনে 5টা নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ের খবর পৌঁছনো মাত্রই চূড়ান্ত তৎপরতা শুরু হয়ে যায় নবান্নে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁর পূর্বনির্ধারিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলন তড়িঘড়ি বাতিল করে দেন। নবান্নের শীর্ষ মহল থেকে তিনি নিজে গোটা উদ্ধারকাজ এবং তৎপরতার বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনিটরিং করেন এবং তারপর পৌঁছন দুর্ঘটনাস্থলে ৷ সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমাতে এবং আটকে পড়া শ্রমিকদের পরিবারের লোকজনকে দ্রুত তথ্য সরবরাহ করতে নবান্নের তরফে ইতিমধ্যেই খোলা হয়েছে বিশেষ কন্ট্রোল রুম এবং চালু করা হয়েছে টোল ফ্রি নম্বর। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় 21 জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তার মধ্যে এখনও পর্যন্ত 5 জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে ৷ তবে, এখনও অন্তত 18 জন শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আহতদের এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে ৷ এঁদের মধ্যে তিন-চার জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এনডিআরএফ, আর্মি, ফায়ার ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সবাই একত্রে কাজ করছেন। রেসকিউ কাজ খুব ভালো চলছে। 21 জনকে উদ্ধার করা গেছে। তিনজন মারা গিয়েছেন এখনো পর্যন্ত। ভিতরে যাঁরা আটকে আছেন, 18 জন মতো তাদের সঙ্গে এনডিআরএফ, আর্মি, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট যোগাযোগ করতে পেরেছে।”

এরপর নবান্নে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “উদ্ধারকার্য চলছে ৷ এন্ট্রি, এগজিট পয়েন্টে সাংবাদিক বন্ধুরা দাঁড়িয়ে ছিলেন ৷ ক্ষতিপূরণ নিয়ে সকাল 11টায় বিবৃতি দেব ৷ এখানে কমপেনসেশন বা অ্য়াকশন নিয়ে বিবৃতি দেব না ৷ কারণ, বিধানসভা চলছে ৷ সিভিল ডিফেন্স, ফায়ার ব্রিগেডকে ধন্যবাদ ৷ মৃত্যুর সংখ্যাটা অনেক লম্বা হতো ৷ আমরা ধন্যবাদ জানাব এনডিআরএফ-এর এই জোনের শীর্ষ কর্তাকে ৷ আমরা সিদ্ধান্ত নিই আর্মিকে ডাকব ৷ দুপুর 3টে 15-20 মিনিট থেকে উদ্ধারে হাত লাগান তারা ৷ আহতরা এসএসকেএম রয়েছেন ৷ সেখানে স্বাস্ব্য দফতরের প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার রয়েছেন, হেলথ সেক্রেটারি রয়েছেন ৷ 20টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, গ্রিন চ্যানেল করে পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছে ৷ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কাজ হচ্ছে ৷” এর আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছন ইন্দ্রনীল খাঁ ৷ তিনি বলেন, “দমকল, পুলিশ, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী পৌঁছে গিয়েছে। সেনা নামানো হয়েছে। আমাদের প্রথম লক্ষ্য প্রাণগুলিকে বাঁচানো। দ্রুত গতিতে উদ্ধার কাজ শুরু করা হয়েছে।” ঘটনাস্থলে 20টি অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে এবং উদ্ধারকাজে সক্রিয় রয়েছে ৷ ইতিমধ্যেই প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের আধিকারিকদের কড়া বার্তা দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এবং এই ধরনের নির্মাণকাজে কোনও রকম পরিকাঠামোগত গাফিলতি রাজ্য সরকার কড়া হাতে দমন করবে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং কলকাতা পুরসভার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর স্মিতা পান্ডে। তাঁরা উদ্ধারকাজ পরিচালনার পাশাপাশি আটকে পড়া শ্রমিকদের পরিবারের লোকজনকে আশ্বস্ত করার কাজও চালাচ্ছেন নিরন্তর। জানা গিয়েছে, ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর 12টা 7 মিনিট। ব্রেসব্রিজ সংলগ্ন ওই নির্মীয়মাণ কারখানাটিতে রোজকার মতোই নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিলেন কয়েক ডজন শ্রমিক। ভারী লোহার বিম সরানো থেকে শুরু করে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ চলছিল পুরোদমে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, আচমকাই কোনও রকম পূর্বাভাস ছাড়াই মাথার ওপর থাকা শেডের একটি সুবিশাল অংশ ভয়ঙ্কর শব্দ করে নিচে আছড়ে পড়ে। নিচে কর্মরত শ্রমিকরা নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যাওয়ার বা নিজেদের বাঁচানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ পাননি। মুহূর্তের মধ্যে ভারী মেটাল ফ্রেম এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর নিচে চাপা পড়ে যান তাঁরা। চারপাশ ঢেকে যায় ধুলোর ঘন আস্তরণে।