মসজিদের লাউডস্পিকার জোর করে খুলে ফেলা হচ্ছে, বিরোধীদের এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিল রাজ্য সরকার । বৃহস্পতিবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় উপাসনাস্থলকে নিশানা করা হয়নি । কলকাতা হাইকোর্টের 2020 সালের নির্দেশ কার্যকর করতেই রাজ্যজুড়ে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে । সেই অভিযানে মসজিদের পাশাপাশি মন্দির থেকেও নিয়ম মেনে লাউডস্পিকার খুলেছে পুলিশ বলে দাবি করেন তিনি । মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আদালতের নির্দেশ বহুদিন আগেই জারি হয়েছিল । বর্তমান সরকার নতুন কোনও আইন তৈরি করেনি, কেবল সেই নির্দেশই বাস্তবায়ন করছে । তিনি বলেন, “এটা 2020 সালের হাইকোর্টের নির্দেশ । শুধু মসজিদের কথা কেন বলছেন ? মন্দিরের কথা বলছেন না কেন ? ধর্মীয় স্থান মসজিদ হোক বা মন্দির, শব্দের মাত্রা তাদের নিজস্ব চত্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে । বাইরে ছড়িয়ে পড়লে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।” বিরোধীদের অভিযোগের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন । তাঁর দাবি, বুধবার পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে মোট 5299টি লাউডস্পিকার খুলেছে পুলিশ । তার মধ্যে 4203টি মসজিদ এবং 1096টি মন্দির থেকে সরানো হয়েছে । সব ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানান তিনি ।মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “পুলিশকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে, কোনওরকম জোরজুলুম করা যাবে না । কথা বলে, বুঝিয়ে, আইন মেনেই কাজ করতে হবে । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মসজিদ ও মন্দির কমিটিগুলি নিজেরাই সহযোগিতা করেছেন ।” নবান্ন সূত্রে জানানো হয়েছে, রাজ্যের 34টি পুলিশ জেলা জুড়েই চলছে এই বিশেষ অভিযান । প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, স্থানীয় মসজিদ ও মন্দির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে । কোনওভাবেই যাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে ।

নিজের বক্তব্যের সমর্থনে কয়েকটি জেলার উদাহরণও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী । তাঁর দাবি, বারুইপুর পুলিশ জেলায় 124টি মসজিদ ও 34টি মন্দির থেকে লাউডস্পিকার খোলা হয়েছে । ডায়মন্ড হারবারে 75টি মসজিদের পাশাপাশি 5টি মন্দির থেকেও মাইক সরানো হয়েছে । এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রশাসনের পদক্ষেপ কোনও ধর্মকে লক্ষ্য করে নয়, বরং আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতেই এই উদ্যোগ ।

এরপরই বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন তৃণমূল সরকারের ভূমিকায় প্রশ্ন তোলেন শুভেন্দু । নাম না করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করে তাঁর প্রশ্ন, 2020 সালে কলকাতা হাইকোর্ট এই নির্দেশ দেওয়ার পর কেন তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া হয়নি ? তাঁর কটাক্ষ, আগের সরকার অন্য ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেও শব্দদূষণ সংক্রান্ত এই নির্দেশের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করেনি ৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই নির্দেশ আমার সরকারের তৈরি নয় । আদালতের নির্দেশ কার্যকর করাই সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব । তাই এটিকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয় ।”

বিরোধীদের উদ্দেশে কড়া বার্তাও দেন তিনি । মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শব্দদূষণ রোধে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতেই সরকার বদ্ধপরিকর । এই ইস্যুকে সামনে রেখে কেউ যদি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর বা মানুষকে উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে প্রশাসন কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে । তাঁর কথায়, “এই সরকার নতুন আইন করছে না, আদালতের নির্দেশই বাস্তবায়ন করছে । কেউ আইন হাতে তুলে নিতে বা উস্কানি ছড়াতে চাইলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।”

রাজনৈতিক মহলের মতে, লাউডস্পিকার ইস্যু ঘিরে রাজ্যে নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হলেও সরকার আদালতের নির্দেশ কার্যকরের যুক্তিকেই সামনে রাখতে চাইছে । অন্যদিকে বিরোধীরা এখনও দাবি করছে, প্রশাসনের পদক্ষেপে বৈষম্য রয়েছে । ফলে এই বিতর্ক আগামী দিনে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না ।